সকাল ৬টা বেজে ৩০ মিনিট, মোবাইলে জোরেশোরে এলার্ম বাজছে। যদিও আমি তখন জেগেই ছিলাম তড়িঘড়ি করে অ্যালার্মটা বন্ধ করলাম কারণ রুমমেটরা ঘুমাচ্ছে এবং আজকে শুক্রবার।
একটা কাজের জন্য বগুড়ায় যেতে হবে এই বিষয়টি নিয়ে কয়েকদিন থেকেই বেশ এক্সাইটেড ছিলাম। কারণ কখনোই উত্তরবঙ্গ বা তার কোনো জেলায় আমি কখনো ভ্রমণ করিনি।
তিনদিন আগেই ট্রেনের টিকেট কেটে রেখেছি।
দক্ষিণ-বঙ্গের ছেলে আমি জীবনে কখনোই ট্রেন ভ্রমণ করিনি। বাস যোগে খুব সহজেই বগুড়া যাওয়া যায় জেনেও ট্রেনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। ছোটবেলা থেকে ইচ্ছে ছিল ট্রেনে চড়ার।
সকাল ৯:১০ মিনিটে ট্রেন ছাড়বে, আমি গোসল করে রেডি হয়ে সাতটার সময় কমলাপুর রেলস্টেশনের উদ্দেশ্য রওনা দিলাম।
কমলাপুর পৌঁছে একটা হোটেল থেকে নাস্তা করে স্টেশনের ভিতর প্রবেশ করলাম, কিছুক্ষণ প্লাটফর্মে পার্ক করে রাখা বেশ কয়েকটি ট্রেন ঘুরে দেখলাম। তারপর ছাউনিতে বসে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।
ঘড়িতে প্রায় ৯:১০ বেজে গিয়েছে কিন্তু ট্রেন আসছে না।
এক ভদ্রলোকের সাথে দাঁড়িয়ে আলাপ করতে লাগলাম ট্রেন এরকম দেরি করে কিনা, উনি বললেন মাঝে মাঝে প্লাটফর্মে সময় মত আসেনা। অপেক্ষা করতে লাগলাম ট্রেন আসার কোনো নাম নেই, এদিকে ঘড়ির কাঁটায় প্রায় দশটা বাজতে চললো।
মনে মনে প্রচুর রাগ হলো নিজের উপর,
কিছুক্ষণের মধ্যেই ১০:১০ মিনটে ট্রেন স্টেশনে আসলো পাক্কা এক ঘণ্টা লেইট!
উফফ”” কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে ট্রেনে উঠলাম।
টিকেট কাটার অভিজ্ঞতা না থাকার কারণে আমি বুঝিনি কোনটা আমার সিট, তো আমি সাত-পাঁচ না ভেবে জানালার পাশের সিটে বসে পরলাম। কিছুক্ষন পরে এক মধ্য বয়স্কা ভদ্রমহিলা এসে বললেন বাবা ঐটা আমার সিট জ-৫৬। আমার সিট ছিল জ-৫৫, আমি তৎক্ষনাৎ সরে গিয়ে ওনাকে বসতে দিলাম।
মনে মনে ভাবলাম জানালার পাশে বসলে একটা জোশ ফিলিংস হতো।
যাইহোক কিছু করার নেই। ১০:৩০ এ রংপুর এক্সপ্রেস রওনা দিলো রংপুরের উদ্দেশ্য। আমার গন্তব্য বগুড়া। পৌছানোর আনুমানিক সময় ছিলো বিকাল ৫:৩০।
পাশের সিটের আন্টির সাথে পরিচিত হলাম। উনি নামবেন সান্তাহার রেলস্টেশনে আমার আগে।
রাতে না ঘুমানোর কারণে ট্রেন ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পরি।
সকাল ১১:৩০ এর দিকে ঘুমভেঙে যায় উঠে দেখি ট্রেন গাজীপুরে। একজন খাবার সাপ্লায়ার আসলেন নাস্তা নিয়ে। ওনার কাছথেকে এক প্যাকেট নাস্তা কিনলাম প্যাকেটে ছিলো একটা চিকেন কাটলেট, একটা চিকেন লেগপিস, আর দুইপিস পাউরুটি। নাস্তা খেয়ে আরো কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিই।

দুপুর ১২:১০ এর দিকে ঘুম থেকে উঠে দেখি টাঙ্গাইলের কোনো এক স্টেশনে ট্রেন দাড়িয়ে আছে, কসর নামজের বিরতি । তারপর ট্রেন ছুটে চললো এলেঙ্গা হয়ে যমুনা সেতুর দিকে। যমুনা সেতু পূর্ব রেল স্টেশনে ট্রেন থেমেছে।
কিছু হকার চিকেন খিচুড়ি বিক্রি করছে দেখলাম। আমিও একজনের থেকে এক প্যাকেট চিকেন খিচুড়ি কিনে নিলাম দুপুরের খাবারের জন্য।
যমুনা সেতু পার হতে হতে দুপুরের খাবার সেরে নিলাম। খাবার টা একদম স্বাদহীন ছিলো। মনে শুধু হলুদ দিয়ে চাল সিদ্ধ করে নিয়ে আসছে। যাইহোক টাকা দিয়ে কিনেছে ফেলেও দিতে পারছিনা আবার পেটে ক্ষুদাও ছিলো।
যমুনা সেতুর পাসে নতুন রেল সেতুর কয়েকটা ছবি তুলে নিলাম। জানালার পাশে না বসতে পারার কারনে ঠিক মত কোনো ছবি তুলতে পারিনি।
ট্রেন চাটমোহর হয়ে ঈশ্বরদী বাইপাসের দিকে, তারমানে এখন পাবনাতে আছি। একজনের কথা মনে পরলো ‘তার বাড়ি পাবনার সুজানগরে’। ম্যাপ ওপেন করে দেখলাম সুজানগর কতদূর এখান থেকে। চাটমোহর থেকে মোটামুটি কাছেই বলা যায়।
ভাবতে ভাবতে ট্রেন এখন নাটোরের দিকে যাচ্ছে। নাটোর স্টেশনে অনেক ট্রেন থেকে যাত্রী নেমে গেল এবং নতুন বেশকিছু যাত্রী উঠলো।
বসে থাকতে থাকতে বোরিং লাগছে তাই কয়েকটা বগি ঘুরে দেখলাম। দরজার কাছে একটু দাড়িয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার ইচ্ছা করছিল বেশ অনেকক্ষন আগে থেকেই, কিন্তু উপায় কই আমি যখনই যাই তখনই দেখি কেউনা কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
একটা লোক অনেকক্ষণ ধরে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো। আমি ঠিক করলাম ওনার পিছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবো যতক্ষণ উনি না সরবে ততক্ষণ। আমি দাঁড়িয়ে থাকার কারণে যাতে উনি বুঝতে পারে আমি ওখানে দাড়াতে চাচ্ছি।

ফাইনালি উনি মুচকি হাসি দিয়ে চলে গেলেন। আমি দরজার সামনে দাড়ালাম। আহহ কি ফিলিংস,,,,,,
অনেকক্ষন এক দৃষ্টিতে বাইরের প্রকৃতি উপভোগ করলাম।
বগিতে প্রবেশ করে নিজের সিটে বসে সামনের দিকে তাকাতেই চমকে উঠলাম! একি,,,, ও এখানে কীভাবে এলো?
আমার সিট থেকে চার সিট সামনে, আর ঐ সিট গুলো উল্টো দিকের মানে আমার সামনা সামনি।
মেয়েটার দিকে চোখে চোখ পড়তেই হার্টবিট কয়েকগুণ বেড়ে গেলো।
মেয়েটাও চোখ সড়িয়ে নিলো হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে ওও আমাকে দেখে অবাক হয়েছে।
হায়হায় আমি যাহ ভাবছি সত্যি নয়তো?
এর চোখতো একদম তার মতই দেখতে (ঐযে পাবনা পার হওয়ার সময় যার কথা মনে পড়ছিল) ।
বোরখা, হিজাব, মুখে মাস্ক আর চোখে চশমা। কিন্তু চোখটা একদম তার মত।
কিন্তু ওরতো এখন ঢাকায় থাকার কথা।
এরকম কিছুক্ষণ ভাবার পরে বুঝতে পারলাম মেয়েটা বারবার আমার দিকে তাকাচ্ছে। আমি যখন ওর দিকে তাকাই তখন ও চোখ সরিয়ে নেয় অন্য দিকে। এরকম চলতে থাকলো ঘন্টা খানেক।
একবার ভাবছিলাম গিয়ে জিগ্যেস করবো কি ব্যাপার।
কিন্তু যায়নি।
কনফিউশান বাদ দিয়ে ইয়ারফোন লাগিয়ে চোখ বন্ধ করলাম।
ট্রেন নওগা জেলা পার হয়ে বগুড়ার দিকে যাচ্ছে। সান্তাহার রেল স্টেশনে পাশের সিটের আন্টি নেমে গেলেন। উনি যাওয়ার পরে আমি জানালার পাশে বসে ট্রেন ভ্রমন উপভোগ করতে লাগলাম।
ঘড়ির কাটায় বিকাল পাঁচটা বেজে পনেরো মিনিট। তার মানে বগুড়া শহরের কাছাকাছি চলে এসেছি। এবার নামার পালা।
আমার সাথে তেমন কোনো জিনিস ছিল না শুধু ছোট একটা অফিস ব্যাগ ছিলো যেটাতে আমি ছোটখাটো প্রয়োজনীয় জিনিস বহন করি। ঐটাই ছিলো শুধু আমার সাথে। বিকাল পাঁচটা একুশ মিনিটে বগুড়া নামলাম। ট্রেন জার্নি এখানেই শেষ।
ঢাকা থেকেই ঠিক করে ছিলাম এখানে এসে “হোটেল ৭১” নামের একটা হোটেলে উঠবো। এখানে সিঙ্গেল রুমের কস্টিং ৫০০ টাকা পার নাইট। কিন্তু আসার আগে এক বড় ভাই বলেছিল এখানে নাকি ২০০-৩০০ টাকায় থাকার মত যায়গা আছে।
স্টেশন থেকে বেরিয়ে ডিসিশন চেঞ্জ করে ফেললাম। থাকবো একরাত, রাতটা পার করতেই পারলেইতো হলো। সাথে ২০০ টাকাও সেভ হবে।
এই ভেবে নবাববাড়ি রোডের একটা বোর্ডিং এ চলে গেলাম। এখানে ৩০০ টাকায় একটা সিঙ্গেল রুম নিলাম সাথে আবার এটাচ বাথ ও আছে। আর পরিবেশ ও ভালোই পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ছিলো।
রুমেই ঢুকেই ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেস হয়ে নিলাম। বাবা-মা দুইজনকেই ফোন করে বললাম ঠিক মতো পৌঁছাতে পেরেছি।
মোবাইলেও চার্জ নেই মোবাইল চার্জ দিলাম। ১৫ মিনিট এর মতো বিছানায় শুয়ে রেস্ট করলাম। ফিল করলাম খুব ক্ষুদা পেয়েছে। শরিরে এনার্জিও নেই। পোশাক পড়ে রুম তালা মেরে নিচে নামলাম।
একটা ছেলেকে জিজ্ঞেস করলাম আশেপাশে দই চিড়ার কোনো দোকান আছে কিনা। বগুড়া আসলাম আর দই খাবনা তা কি হয়।
ছেলেটা বললো আপনার পেছনেইতো দই চিড়ার দোকান।
ওহহ খেয়ালই করিনি।
খুব মজা করে বগুড়ার দই চিড়া খেয়ে নিলাম। লম্বা জার্নিতে শরীর এখন ক্লান্ত। খুব ঘুম পাচ্ছে।
বোর্ডিংয়ে রুমে গিয়ে লাইট অফ করে একটা ঘুম দিলাম।
ঘুম ভাঙলো আমার বড়ো বোনের ফোনে।
– কিরে কি অবস্থা তোর ঠিক মতো পৌঁছাতে পারছিস।
হুম। রুমে ঠুকেই ফ্রেস হয়ে নাস্তা করে একটা ঘুম দিয়েছিলাম মাত্র উঠলাম।
– ওহহ সাবধানে থাকিস।
আচ্ছা। আল্লাহ হাফেজ।
এরপর আমার মা ভিডিও কলে কথা বললো কিছুক্ষণ।
বন্ধুদের সাথে গ্রুপ ভিডিও কলে আড্ডা দিলাম বেশ খানিক্ষন।
ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচ চলছিল মোবাইলে কিছুক্ষণ খেলা দেখে রাত নয়টার পরে বেরিয়ে পরলাম শহড়টা ঘুরে দেখতে।
নিরিবিলি ছোট একটা শহর। এই রাতে কোথায় ঘুরবো আর কিই বা দেখবো বুঝতে পারছি নাহ। আসপাশে একটু ঘুরে দেখলাম, কিছুক্ষণ হাঁটলাম।
পেটে তেমন একট খুদা নেই। তারপরই ভাবলাম একসাথে রাতের খাবার খেয়েই রুমে যাই।
একটা হোটেল থেকে ভাত, গরুর মাংস আর ডাল দিয়ে রাতের খাবার টা সেরে ফেললাম।
বোর্ডিং এ এসে একটা ঘুম দিলাম।
চলবে ……
১৭ই সেপ্টেম্বর ২০২৩
