যে বাসায় এখন থাকি, উঠেছি ঠিক এক বছর হলো। আমি যে ফ্লোরে থাকি এটা ৭ তলায় আর আমার রুমের জানালার একদম সামেনের ছয়তলা বিল্ডিংয়ের এই ছাদটা আমার খুব প্রিয় একটা জায়গা।
সারাদিনের অফিসের ক্লান্তি মুছে দেয়ার জন্য রাতে জানালার সামনে বসে বই পড়তে পড়তে চা খাই, বাগানের গাছ গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকি, কখনো আকাশ দেখি, কখনো হেডফোন লাগিয়ে জানালার সামনে দাড়িয়ে থাকি চুপচাপ।
ছাদের সামনে আরেকটা আটতলা বিল্ডিং। শুনেছি, তার সাত ও আট তলায় অনেক বছর ধরেই কেউ থাকে না। বাড়িওয়ালা চেষ্টা করেও ভাড়াটিয়া জোগাড় করতে পারেননি।
তবে একটা বিষয় আমাকে বরাবরই অস্বস্তিতে ফেলে। আমি প্রায়ই দেখি সেই পরিত্যক্ত বিল্ডিংয়ের সাততলার একটা জানালায় এক কিশোরী মেয়ে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে। বয়স আনুমানিক ১৬-১৭। তার চোখ দুটো অদ্ভুতভাবে স্থির, যেন এক ধরনের যন্ত্রণাবোধ বা অভিমান চেপে বসে আছে সেখানে।
দিনের বেলায় সে প্রায় দেখা যায় না। কিন্তু সন্ধ্যা বা রাত হলে জানালার কাছে দাঁড়িয়ে যায়, একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে আমাদের বিল্ডিংয়ের দিকে। মাঝে মাঝে মনে হয় ঠিক যেন আমাকে দেখছে।
শুরুতে ভাবতাম, হয়তো কেউ মাঝে মাঝে ওখানে আসে। কিন্তু রিসেন্টলি প্রতিবেশীদের কাছে শুনলাম, গত দুই বছর কেউ ওখানে আসেনি। এমনকি সাততলার লাইটও জ্বলে না কখনো।
আমি নিজের বিশ্বাস করতে পারলাম না, কয়েকদিন শুধু ট্রমার মধ্যে আছি। কিন্তু এখন যা হলো, তা আমার বিশ্বাসের সীমাকেও ছাড়িয়ে যায়।
জানালার সামনে বসে চুপচাপ আকাশ দেখছিলাম। হঠাৎ মনে হলো, কেউ যেন আমার নাম ধরে ডাকলো।
— “সাদ…”
চমকে পেছনে তাকালাম, কিন্তু কেউ নেই।
হঠাৎ চোখ গেল সেই পুরনো বিল্ডিংয়ের জানালায়। মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু আজকে ওর চেহারাটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। চোখে একধরনের কষ্ট আর ক্ষোভ মিশে আছে। ঠোঁট কাঁপছে, যেন কিছু বলছে। কিন্তু কোনো শব্দ নেই।
পরদিন সকালে সাহস করে সেই বিল্ডিংয়ের দারোয়ানকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম—
— “ভাই, সাততলায় কি কেউ মাঝেমাঝে আসে?”
দারোয়ান ঘাড় নাড়ল, “না ভাই। ওই তলা অনেকদিন তালাবন্ধ। অনেকে বলে, এক মেয়ে আত্মহত্যা করেছিল ওখানে তিন বছর আগে। পারিবারিক ডিপ্রেশনে। এরপর থেকে নাকি অনেকেই মাঝরাতে কেউ কেউ জানালায় তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে।”
আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। কণ্ঠ শুকিয়ে এল।
— “মেয়েটার নাম কি জানেন?”
— “হুম… মনে আছে। অনন্যা। বয়স এই ধরেন ১৬ – ১৭ হয়েছিল ।”
সেই মুহূর্তে আমার শিরদাঁড়ায় ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল।
কারণ, আমি তখনই বুঝে ফেলি— সেই জানালার মেয়েটি জীবিত কেউ নয়। সে অপেক্ষা করছে… হয়তো কোনো অসমাপ্ত কথা বলার জন্য। অথবা… কাউকে সঙ্গে নিয়ে যাবার জন্য।
জানালার মেয়ে
Saad ডায়েরী ツ
২৪ -০৭ – ২০২৫